চেকের মামলা: ডিজঅনার হলে আপনার করণীয় ও আইনি সুরক্ষা

আধুনিক ব্যবসায়িক এবং ব্যক্তিগত লেনদেনে চেক একটি অপরিহার্য ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি কেবল একটি কাগজের টুকরো নয়, বরং এটি একটি আর্থিক প্রতিশ্রুতি এবং আস্থার প্রতীক। কিন্তু এই আস্থা তখনই মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়, যখন কোনো চেক অপর্যাপ্ত তহবিল বা অন্য কোনো আইনি ত্রুটির কারণে ব্যাংক থেকে প্রত্যাখ্যাত বা ‘ডিজঅনার’ হয়। চেক ডিজঅনার হওয়া কেবল পাওনাদারের জন্য আর্থিক ক্ষতি এবং হয়রানির কারণই নয়, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। The Negotiable Instruments Act, 1881-এর অধীনে এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে, আইন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকেই সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারেন না, ফলে তাঁদের প্রাপ্য অর্থ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এই ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে প্রতিটি পদক্ষেপ সতর্কতার সাথে গ্রহণ করা এবং একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

কেন একটি চেক ডিজঅনার হয়?

একটি চেক বিভিন্ন কারণে ব্যাংক কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। ডিজঅনারের কারণটি ব্যাংক একটি ‘রিটার্ন মেমো’ বা ‘ডিজঅনার স্লিপ’-এর মাধ্যমে উল্লেখ করে দেয়। কিছু প্রধান কারণ হলো:

  • অপর্যাপ্ত তহবিল (Insufficient Funds): এটিই সবচেয়ে সাধারণ কারণ, যেখানে চেকদাতার অ্যাকাউন্টে চেকে উল্লিখিত পরিমাণ অর্থ থাকে না।
  • স্বাক্ষরের অমিল (Signature Mismatch): চেকে প্রদান করা স্বাক্ষরটি ব্যাংকে সংরক্ষিত নমুনা স্বাক্ষরের সাথে না মিললে চেকটি ডিজঅনার হয়।
  • অ্যাকাউন্ট বন্ধ (Account Closed): চেকদাতা যদি তাঁর অ্যাকাউন্টটি ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেন।
  • পেমেন্ট স্থগিতের নির্দেশ (Stop Payment Instruction): চেকদাতা কোনো কারণে ব্যাংককে উক্ত চেকের পেমেন্ট বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দিলে।
  • মেয়াদোত্তীর্ণ চেক (Stale Cheque): সাধারণত একটি চেক ইস্যু করার তারিখ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এই সময়সীমা পার হয়ে গেলে চেকটি ডিজঅনার হয়ে যায়।
  • ভুল বা অস্পষ্ট তারিখ: চেকে তারিখ ভুলভাবে লেখা হলে বা তারিখের উল্লেখ না থাকলে।
  • কাটাকাটি বা পরিবর্তন (Alteration): চেকে কোনো ধরনের ঘষামাজা, কাটাকাটি বা পরিবর্তন থাকলে এবং সেই পরিবর্তনের পাশে চেকদাতার পূর্ণ স্বাক্ষর না থাকলে ব্যাংক চেকটি প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

চেক ডিজঅনার হলে আপনার করণীয়: ধাপে ধাপে আইনি প্রক্রিয়া

চেক ডিজঅনার হলে আইন অনুযায়ী প্রতিকার পাওয়ার জন্য আপনাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কিছু নির্দিষ্ট ধাপ ও সময়সীমা অনুসরণ করতে হবে।

ধাপ ১: ব্যাংক থেকে ডিজঅনার স্লিপ সংগ্রহ যখন আপনার জমা দেওয়া চেকটি ডিজঅনার হবে, তখন ব্যাংক আপনাকে একটি ‘রিটার্ন মেমো’ বা ‘ডিজঅনার স্লিপ’ দেবে, যেখানে চেকটি ডিজঅনার হওয়ার কারণ উল্লেখ থাকবে। এই স্লিপটি মামলার জন্য একটি অপরিহার্য দলিল, তাই এটি যত্ন সহকারে সংগ্রহ করুন।

ধাপ ২: লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ) আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার প্রথম এবং বাধ্যতামূলক ধাপ হলো চেকদাতাকে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো।

সময়সীমা: ব্যাংক থেকে চেক ডিজঅনার হওয়ার তথ্য জানার৩০ দিনের মধ্যে আপনাকে এই নোটিশ পাঠাতে হবে।

নোটিশের বিষয়বস্তু: নোটিশে, ডিজঅনার হওয়া চেকের সম্পূর্ণ বিবরণ (চেক নম্বর, তারিখ, টাকার পরিমাণ, ডিজঅনারের তারিখ) উল্লেখ করে চেকদাতাকে নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেকে উল্লিখিত সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করার জন্য আহ্বান জানাতে হবে।

প্রেরণের পদ্ধতি: এই নোটিশ অবশ্যই প্রাপ্তি স্বীকারসহ রেজিস্টার্ড ডাকযোগে (Registered Post with A/D) পাঠাতে হবে। এর মাধ্যমে প্রমাণ থাকে যে, চেকদাতা নোটিশটি পেয়েছেন। প্রয়োজনে, বহুল প্রচারিত কোনো জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমেও নোটিশ জারি করা যায়।

ধাপ ৩: মামলা দায়ের আপনি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পর যদি চেকদাতা নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তবে আপনি তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করার অধিকারী হবেন।

  • সময়সীমা: নোটিশ পাওয়ার পর টাকা পরিশোধের ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আপনাকে মামলাটি দায়ের করতে হবে। এই সময়সীমা কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না, কারণ এরপর মামলা করার আইনি অধিকার নষ্ট হয়ে যায়।
  • এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত: মামলাটি এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করতে হবে।
  • প্রয়োজনীয় নথি: মামলার আরজির সাথে অবশ্যই মূল চেক, ব্যাংকের ডিজঅনার স্লিপ, লিগ্যাল নোটিশের কপি, রেজিস্টার্ড ডাকের রশিদ এবং প্রাপ্তি স্বীকারের রশিদ জমা দিতে হবে।

শাস্তি ও প্রতিকার

The Negotiable Instruments Act, 1881-এর ১৩৮ ধারার অধীনে চেক ডিজঅনারের অপরাধ প্রমাণিত হলে, আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে উল্লিখিত অর্থের তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারেন। আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত জরিমানার অর্থ সাধারণত চেকের পাওনাদারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করা হয়।

শেষ কথা

চেকের মাধ্যমে লেনদেন একদিকে যেমন সুবিধাজনক, তেমনই এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও কম নয়। চেক ডিজঅনারের মতো একটি জটিল আইনি বিষয়ে সামান্য ভুল বা অসতর্কতা আপনার পুরো মামলাকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে, নোটিশ পাঠানো এবং মামলা দায়েরের কঠোর সময়সীমা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। তাই, এই ধরনের পরিস্থিতিতে আবেগপ্রবণ না হয়ে বা ব্যক্তিগতভাবে বিবাদে না জড়িয়ে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হলো সবচেয়ে নিরাপদ এবং কার্যকর উপায়। একজন দক্ষ আইনজীবী আপনার মামলার সব আইনি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে আপনার প্রাপ্য অধিকার আদায়ে সঠিক পথে সহায়তা করতে পারেন।

যেকোনো ধরনের চেকের মামলা, বাণিজ্যিক আইন বা এ সংক্রান্ত যেকোনো জটিল বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা ও আইনি পরামর্শের জন্য এডভোকেট এইচ এম হেলালের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তিনি তার চেম্বারে (মক্কা টাওয়ার, ৩য় তলায়, ডিসি অফিসের পশ্চিমে, জি.টি. রোড দক্ষিণ, চেয়ারম্যানঘাট, চাঁদপুর) নিয়মিত আইনি পরামর্শ দিয়ে থাকেনযোগাযোগ: 01712771190।

You can share this post!

ফৌজদারি আইন ও পুলিশি মামলা - আপনার যা জানা জরুরি

বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরুর আইনি প্রক্রিয়া: ট্রেড লাইসেন্স থেকে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন

author

Admin

By Admin

No bio available for this author.

03 Comments

  • comments

    Nitiya , August 29, 2017

    Borem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text.

  • comments

    Fahim , August 29, 2017

    Borem Ipsum is simply dummy text of the printing and typesetting industry Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text.

Leave Comments